আমির হোসেন,স্টাফ রিপোর্টার:
তাহিরপুরে কাগজে-কলমে ৮৫ ভাগ বাঁধের কাজ বাস্তবে এর ছিটেফোঁটাও নেই সুনামগঞ্জ জেলার তাহিরপুর উপজেলার হাওরের বোরো ফসল রক্ষা বাঁধের কাজ উপজেলা প্রশাসনের কাগজে-কলমে ৮৫ ভাগ দেখানো হলেও বাস্তবে এর ছিটেফোঁটাও নেই। ২৮ ফেব্রুয়ারী ফসল রক্ষা বাঁধের কাজ শেষ হওয়ার আর মাত্র ৩ দিন বাকী। কিন্তু হাওর রক্ষা বাঁধের কাজ শেষ হওয়াতো দূরের কথা এখনো অনেক( পি আই সি)তেই শুরু হয়নি মাটির কাজেই। সময় মতো বাঁধের কাজ শেষ না হলে এবার আগাম পাহাড়ি ঢলের পানিতে তাদের একমাত্র বোরো ফসল হারানোর শঙ্কায় উদ্বিগ্ন প্রকাশ করে হাওর পাড়ের কৃষক পরিবার গুলো। যেখানে সরকারি নিয়ম অনুয়ায়ী বাঁধের কাজ শেষ হওয়ার কথা সেখানে গতকাল ২৪ ফেব্রুয়ারী সোমবারসরেজমিন ঘুরে দেখা যায়, উপজেলা সদর লাগোয়া তাহিরপুর থানার সামনে বৌলাই নদীর উত্তর পাশে ব্রীজের পশ্চিম দিকে রতনশ্রী গ্রামের সামনে দিয়ে নদীর পাড় হয়ে বড়দল গ্রামের যাওয়ার রাস্তায় মাটিয়ান হাওরের ৪১ নং পিআইসি। এতে আড়াই কিলোমিটার বাঁধের কাজের বরাদ্দ দেয়া হয় ৯ লাখ টাকা। ৪১ নং পিআইসি'তে গতকাল ২৪ ফেব্রুয়ারী সোমবার সকালে শুরু করে মাটি ফেলার কাজ। এই পিআইসির সভাপতি তাহিরপুর সদরের তাজুল মিয়া। শুধু ৪১ নং পিআইসি'ই নয়! মাটিয়া হাওরের আরও ৩ টি পিআইসি'তে এই নিউজ লিখা পর্যন্ত মাটির কাজেই শুরু হয়নি। মাটি না পাওয়ার কারণে এরকম আরও কয়েকটি পিআইসি আছে বাঁধের কাজ শুরু করা যাচ্ছেনা বলে জানিয়েছেন তাহিরপুর উপজেলার দায়িত্বে থাকা পাউবোর উপসহকারী প্রকৌশলী মনির হোসেন। হাওরে ফসল রক্ষা বাঁধ নির্মাণের সময় সীমা ১৫ই ডিসেম্বর থেকে ২৮ ফেব্রুয়ারি। সেই হিসাবেই আর ৩ দিন বাকী। বাঁধ নির্মাণ ও মেরামতের কাজ শেষ করারতো দূরের কথা। এখনও চলছে মাটির কাজ, এছাড়াও পি আই সি গুলোতে সাইনবোর্ড টানানোর কথা থাকলেও নেই বেশি ভাগ বাঁধে কোনো সাইনবোর্ড। হাওর পাড়ের স্থানীয় কৃষকেরা জানান,মাটির কাজই শেষ হতে আরও ১৫ দিনেরও বেশি সময় লাগতে পারে। বাঁধের কাজ ১৫ জানুয়ারি শুরু হওয়ার কথা থাকলেও
কাজ শুরু করে ১৫ দিন পরে। দেরিতে বাঁধ শুরু করায় আমাদের চিন্তা বাড়ে। আর প্রতি বছরের মত এবারও নির্ধারিত সময়ে কাজ শেষ না হওয়ার আগাম পাহাড়ী ঢলের পানিতে কষ্টে ফলানো বোরো ধান পানিতে তলিয়ে যাওয়ার শংকায় উৎবেগ আর উৎকন্ঠা বিরাজ করছে কৃষকদের মধ্যে পাশাপাশি ক্ষোভও বাড়ছে। অভিযোগ উঠেছে, বেশির ভাগ কাজ শুরু হয়েছে ফেব্রুয়ারি মাসে। অনেক বাঁধের নিচে মাটির বদলে দেওয়া হয়েছে বালু। তবে কৃষকরা চাইছে কাজ তাড়াড়াড়ি হোক। সুনামগঞ্জ পাউবো সূত্রে জানা গেছে, তাহিরপুর উপজেলার ছোট বড় ২৩ টি হাওরের বোরো ফসল রক্ষা বাঁধা মেরামতের জন্য চলতি বছর সরকার ৭৬ টি প্রকল্পের বরাদ্দ দেয় ১২ কোটি ৭৬ লাখ টাকা। পাউবোর অগ্রগতি প্রতিবেদন অনুযায়ী জেলার ১২টি উপজেলার মধ্যে সবচেয়ে কম কাজ হয়েছে তাহিরপুর উপজেলায়। এই উপজেলায় ৭৬টি প্রকল্পে ১২ কোটি ৫৪ লাখ টাকা ব্যয়ে কাজের অগ্রগতি কাগজে-কলমে দেখানো হয়েছে ৮৫ ভাগ। এ উপজেলার আড়াই কোটি টাকার বোরো ধান উৎপাদন হয়।
এদিকে পানি উন্নয়ন বোর্ডের(পাউবো) গত সোমবার পর্যন্ত কাজের অগগ্রতি ৮৫ শতাংশ শেষ জানালেও এই দাবির সঙ্গে এক মত নন হাওর বাঁচাও আন্দোলন সংগঠনের কেন্দ্রীয় কমিটির সাধারণ সম্পাদক বিজন সেন রায়। তিনি ক্ষোভের সাথে জানিয়েছেন,প্রতি বছরেই পাউবোর হিসাবের সঙ্গে বাঁধের কাজের বাস্তবতার কোনো মিল পাওয়া যায় না। বাস্তবে মাঠের অবস্থা ভাল নয়। কাজে শুরু থেকেই গাফিলতি ছিল এখনও আছে। এবারও নির্ধারিত সময়ে কাজ শেষ না হয় তাহলে ফসল ঝুঁকিতে পড়বে এর দায় সংশ্লিষ্ট কতৃপক্ষকে নিতে হবে। জেলার তাহিরপুর উপজেলার সদরের থানার সামনে মাটিয়ান হাওর,টাংগুয়ার হাওরসহ কয়েকটি প্রকল্পের ফসল রক্ষা বাঁধের কাজের খোঁজ নিয়ে বাঁধের অবস্থা ভাল নয় তার মিল পাওয়া গেছে। কাজ শুরুই হয়েছে নির্ধারিত সময়ে এক মাসের পরে। এর মধ্যে কিছু কিছু প্রকল্পে মাটি ফেলে কাজ বন্ধ করে রাখাও হয়েছে। আবার কোন কোন প্রকল্পে কাজ শুরু হয়েছে মাত্র তিন থেকে চার দিন আগে। এছাড়াও তাহিরপুর উপজেলার ৪৭, ৪৮, ৪৯, ৫০, ৫১, ৫২, ৫৩, ৫৪ নং পিআইসির কাজ সম্প্রতি শুরু হয়েছে। এভাবে অন্যান্য হাওরের ফসলরক্ষা বাঁধের কাজও ধীর গতিতে চলছে। তাহিরপুর উপজেলার মাটিয়ান হাওরের ফসল রক্ষায় পূর্ব পাড়ে কেন্দুয়া নদীর তীর ঘেঁষে গাজীপুর গ্রামের মধ্যবর্তী স্থানে ৬৮ নম্বর প্রকল্প। এই প্রকল্পের সাধারণ সম্পাদক সোলায়মান মিয়া বলেন,এক দিকে মাটি পাওয়া যায় না অন্য দিকে বিলও দিছে মাত্র এক কিস্তি। আবার মেশিন(এক্সকাভেটর)দিয়ে কাজ করাব সেটিও অন্য জায়গায় কাজ করতেছে। এই বাঁধের কাজ এক সপ্তার মধ্যেই কাজ শেষ করমু। মাটিয়ান ও টাংগুয়ার হাওর পাড়ের কৃষক চান্দু মিয়া(৭০) উদ্বেগ প্রকাশ করে জানিয়েছেন হাওরে বাঁধ নির্মাণ কাজ শুরুতে দায়সারা লোক দেখানো কাজ আর শেষে দিকে তাড়াহুড়া করে কাজ চলছে এতে কাজের নামে টাকা লুটপাটের মহোৎসব দেখা গেছে। যে কাজ হচ্ছে এই কাজে কৃষকের কোনো উপকার হবে না। সামান্য পানির ধাক্ষায় বাঁধ ভেঙে যাবে। তবে বাঁধ সংশ্লিষ্টদের পকেট ভরেছে।
তাহিরপুর উপজেলার দায়িত্বে থাকা পাউবোর উপসহকারী প্রকৌশলী মনির হোসেন জানান,শুরুতে পিআইসি গঠনে বিলম্ব হয়েছে। এবং হাওর থেকে ধীরগতিতে পানি নামার কারণে আবার মাটিও না পাওয়ার কারণেও বাঁধের কাজ শুরু করতে একটু দেরি হয়েছে। তাহিরপুর সদর লাগোয়া ৪১ নং পিআইসি'তে প্রায় এরমাস পর মাটি ফেলার কাজ শুরু করলেন কেন? জানতে চাইলে তিনি জানান, এই প্রকল্প দেড় কিলোমিটারের মধ্যে ১০০ মিনিট বাঁধের কাজ মাটি না পাওয়ার কারণে শুরু করতে পারিনি। এখন এখন বড়দল গ্রামের পাশ থেকে ছোট ছোট ট্রলি দিয়ে মাটি এনে কাজ শুরু করেছি। নির্ধারিত সময়ে কাজ শেষ করতে পারবেনা কি না! জানতে চাইলে তিনি জানান, নির্ধারিত সময়েই বাঁধের কাজ শেষ করার জন আমরা চেষ্টা করছি। তবে নির্ধারিত সময়ে মাটির কাজ শেষ হয়ে যাবে। যেটুকুই বাকি থাকবে তা শেষ করতে নির্ধারিত সময়ের ৫/৬ দিয়ে বেশি লাগতে পারে।