শুক্রবার, ২৮ ফেব্রুয়ারী ২০২৫, ০৯:৫১ অপরাহ্ন

হে অমর একুশে, তোমায় ভুলিনি, ভুলব না

Coder Boss
  • Update Time : শুক্রবার, ২৮ ফেব্রুয়ারী, ২০২৫
  • ১১ Time View

মহম্মদ মফিজুল ইসলাম
————————————-
ভাঙড়, দক্ষিণ ২৪ পরগণা
পশ্চিমবঙ্গ, ভারত

” আমার ভাইয়ের রক্তে
রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারি
আমি কি ভুলিতে পারি
ছেলে হারা শত মায়ের
অশ্রু ঝরা এ ফেব্রুয়ারি
আমি কি ভুলিতে পারি ”

না। ভুলতে পারি না। ভোলা যায় না। জীবনের সুখ-দুঃখ, হাসি-কান্না, বিরহ-মিলনের কত ঘটনাই না ঘটে চলেছে রোজ। ঘটে চলেছে স্মরণ- বিস্মরণের মালা গাঁথা। কালের শাশ্বত নিয়মে কিছু ঘটনা বিস্মৃতির আড়ালে চলে যায়। আবার এমন কিছু ঘটনা মনের মণিকোঠায় অক্ষয় স্থান করে নেয় যেগুলো ভোলা যায় না।

একুশে ফেব্রুয়ারি সেই রকম একটি ঘটনা। সেই রকম একটি দিন। এই দিন কেবলমাত্র ক্যালেন্ডারের একটি তারিখ নয়। এই দিন বিশ্বের ইতিহাসে এক তাৎপর্যপূর্ণ দিন। মাতৃভাষাপ্রেমী সকলের কাছে এই দিন সংগ্রামের দিন। শপথের দিন। একুশে ফেব্রুয়ারি এখন আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস। এই দিন মাতৃভাষার প্রতি গভীর শ্রদ্ধা জানানোর দিন। মাতৃভাষার প্রতি ভালবাসা জানানোর দিন। এই দিন মাতৃভাষার মর্যাদা রক্ষা করার দিন।

শিশু প্রথম কথা বলতে শেখে তার মায়ের মুখের ভাষাতেই। সেই মায়ের মুখের ভাষাই মাতৃভাষা। আর সেই মায়ের মুখের ভাষাই যদি কেউ জোর করে কেড়ে নিতে চায় তাহলে শরীরের সমস্ত শক্তি দিয়ে, বুকের শেষ রক্তবিন্দু দিয়ে তার মর্যাদা রক্ষা করব—- এমন বজ্র কঠিন সংকল্প নিয়ে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের বাংলা মায়ের দামাল ছেলেরা স্বৈরাচারী শাসক গোষ্ঠীর চাপিয়ে দেওয়া উর্দু ভাষায় প্রতিবাদ করেছিল।

তীব্র প্রতিবাদে সোচ্চার হয়েছিল ছাত্র-যুবরা। তারা দৃপ্ত কণ্ঠে ঘোষণা করেছিল আমার মায়ের মুখের ভাষা, বাংলা ভাষা আমরা কোনও মতে কেড়ে নিতে দেব না। তাদের সঙ্গে গলা মিলিয়ে একে একে সোচ্চার হন শিক্ষক, বুদ্ধিজীবী সকলেই। শিক্ষার অঙ্গন পেরিয়ে এই আন্দোলনের ঢেউ ক্রমশ ছড়িয়ে পড়ে সমাজের সর্বস্তরে। স্বতঃস্ফূর্তভাবে অন্য মাত্রা পায় এই আন্দোলন। তারই ফলশ্রুতি ১৯৫২’র একুশে ফেব্রুয়ারি।

১৯৪৭ সালে স্বাধীনতা লাভের পরই দ্বিখন্ডিত হয়ে যায় ভারতবর্ষ। জন্ম হয় নতুন রাষ্ট্র পাকিস্তানের। অবিভক্ত বঙ্গভূমির পূর্ব দিকের বেশি অংশ নিয়ে গঠিত হয় পূর্ব পাকিস্তান (বর্তমান বাংলাদেশ) আর পশ্চিমাংশ নিয়ে গঠিত হয় পশ্চিম পাকিস্তান।

পূর্ব পাকিস্তানের শতকরা ৯৮ ভাগ মানুষ-ই ছিল বাংলা-ভাষী। ১৯৪৬ সালে ‘বঙ্গীয় প্রাদেশিক মুসলিম লিগে’র পক্ষ থেকে ঘোষণা করা হয় পূর্ব পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা হবে বাংলা। কিন্তু বাস্তবে তা কার্যকর হয়নি। পশ্চিম পাকিস্তানের উর্দু ভাষাপ্রেমী রাষ্ট্রনায়কদের ইচ্ছায় পূর্ব পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা হিসেবে চাপিয়ে দেওয়া হয় উর্দুকে। স্বৈরাচারী শাসকের এই অপচেষ্টার বিরূদ্ধে প্রতিবাদে সোচ্চার হন ছাত্র-শিক্ষক-বুদ্ধিজীবী সকলেই।

১৯৪৮ সালে গঠিত হয় ‘রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ’।তাদের দাবি, পূর্ব পাকিস্তানের সমস্ত স্তরে বাংলা ভাষাকে স্বীকৃতি দিতে হবে এবং উর্দুর পাশাপাশি বাংলাকেও পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা করতে হবে। ১৯৫২ সালের ৩০ জানুয়ারি তৎকালীন সরকারের পক্ষ থেকে ঘোষণা করা, বাংলা নয়, উর্দুই হবে পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা। ফলে আন্দোলন তীব্র থেকে আরও তীব্রতর হয়। পরিষদের পক্ষ থেকে ২১ ফেব্রুয়ারি দিনটিকে ‘রাষ্ট্রভাষা দিবস’ হিসেবে পালন করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।

সমস্ত শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ধর্মঘটের ডাক দেওয়া হয়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় চত্বরে একটি প্রতিবাদ সভার আয়োজন করা হয়। এদিকে আগের দিন বিকেল থেকেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় চত্বরে ১৪৪ ধারা জারি করা হয়। জারি করা হয় সভা সমাবেশের বিরুদ্ধে কঠোর নিষেধাজ্ঞা। সমস্ত নিষেধাজ্ঞা অগ্রাহ্য করে একুশে ফেব্রুয়ারি প্রতিবাদ মিছিল করে ছাত্ররা। পুলিশ লাঠি চালায়। কাঁদানে গ্যাস ছোঁড়ে। ছাত্ররাও এগিয়ে যায়। এবার নির্মমভাবে গুলি চালায় পুলিশ। মাটিতে লুটিয়ে পড়ে বরকত, রফিক, সালাম, জব্বার, শফিউর সহ আর কত নাম না জানা তরুণেরা। ঢাকার পিচ ঢালা রাজপথ রক্তাক্ত হয় তাদের বুকের তাজা রক্তে।

মাতৃভাষার জন্য তাদের প্রাণদানের এই দৃষ্টান্ত গোটা বিশ্ববাসীকে বিস্মিত করে। রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারির এই অদম্য অনুপ্রেরণা সঞ্চারিত হয় তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের (বর্তমান বাংলাদেশের) সমস্ত মানুষের মধ্যে। ফলশ্রুতি—১৯৫২ সালেই অন্যতম রাষ্ট্রভাষা হিসেবে স্বীকৃতি পায় বাংলা ভাষা।

আর এই বাংলা বাংলা ভাষার ওপর ভিত্তি করে জন্ম হয় স্বাধীন সার্বভৌম রাষ্ট্র বাংলাদেশের। বাংলা ভাষায় জন্য আত্মবলিদানের এই বিরল দৃষ্টান্তের কথা স্মরণ করে ইউনাইটেড নেশনস্ এডুকেশনাল সায়েন্টিফিক অ্যান্ড কালচারাল অর্গানাইজেশন (ইউনেস্কো)’র পক্ষ থেকে একুশে ফেব্রুয়ারি দিনটিকে ‘আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস’ হিসেবে ঘোষণা করা হয়।

ইউনেস্কো’র এই সিদ্ধান্ত নিঃসন্দেহে সাধুবাদযোগ্য। আমরা বাঙালি। বাংলা আমাদের মাতৃভাষা। আমাদের সেই বাংলা ভাষা মর্যাদা পেল আন্তর্জাতিক স্তরে। একথা ভাবলেই এক অনাবিল আনন্দ ও গর্বে আমাদের বুক ভরে ওঠে।

বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে একুশে ফেব্রুয়ারিকে ‘আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস’ হিসেবে পালন করার ব্যাপক তোড়জোড় ও উৎসাহ লক্ষ্য করা যাচ্ছে। বিশেষভাবে নির্মিত শহিদ বেদীতে পুষ্পমাল্য অর্পণ করার প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে। বীর শহীদদের স্মরণ করে তাঁদের আত্মার প্রতি গভীর শ্রদ্ধা নিবেদন করার আয়োজন চলছে। জেলায়-জেলায়, গ্রামে-গঞ্জে নানা বর্ণময় অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়েছে। প্রত্যেকের এই উৎসাহ চোখে পড়ার মতো।

তবু আনুষ্ঠানিক শ্রদ্ধাজ্ঞাপন এই দিনটিকে স্মরণ করার পক্ষে যথেষ্ট নয়। উৎসব, উদ্দীপনা ও কর্মসূচী উদযাপন করলেই আমাদের দায়িত্ব শেষ হয়ে যাবে না। শিক্ষার অঙ্গনে মাতৃভাষাকে বিশেষ গুরুত্ব ও মর্যাদা দিতে হবে। গুরুত্ব দিতে হবে অফিস- আদালতে, সরকারি কাজকর্মে।

একথা অনস্বীকার্য, মাতৃভাষার পর্যাপ্ত গুরুত্ব না দেওয়ায় শিক্ষার গুণগত মানও নিম্নমুখী হচ্ছে। মাতৃভাষাকে অবহেলা করে কোনও জাতিই উন্নতির চরম শিখরে পৌঁছতে পারে না। পরিতাপের বিষয়, এত প্রয়াস সত্ত্বেও অধিকাংশ জায়গায় মাতৃভাষা আজও উপেক্ষিত। একুশে ফেব্রুয়ারি আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসেই সেই উপেক্ষা কাটিয়ে ওঠবার দিন। এই দিন মাতৃভাষার হৃতগৌরব প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে ফের শপথ নেওয়ার দিন।

Please Share This Post in Your Social Media

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category
© All rights reserved © 2024 Coder Boss
Design & Develop BY Coder Boss
themesba-lates1749691102